স্বপ্ন
পর্বঃ ৩ (শেষ)
লেখকঃ সিয়াম হোসেন
আমির সাহেব বেশ কঠিন ভাব করে চেয়ারে বসে আছেন৷ নীলা এখনো আসেনি তার রাগটা আরও বেড়ে যাচ্ছে। রাহেলা বেগম ঘরে প্রবেশ করলেন তার হাতে কাচের গ্লাস যার মাঝে আছে লেবুর শরবত৷ নীলা রাহেলা বেগমের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।
- নীলা..
- হ্যাঁ বাবা..
- এখানে আমার পাশে এসে বসো তোমার সাথে কিছু কথা আছে।
নীলা মাথা নিচু করে বাবার পাশে বসলেন৷
- রাহেলা তুমি এখান থেকে যাও আর না যেতে চাইলে ওই সোফায় গিয়ে বসো।
রাহেলা বেগম চেয়ারে বসলেন৷
নীলা ঘামছে সে জানে তার বাবা এখন তাকে কি বলবে৷ নীলা ইদানীং বেশ অদ্ভুত রকম স্বপ্ন দেখছে স্বপ্নে সে নীলাকে যা বলছে তাই হচ্ছে তার সাথে৷ এটাকে কো-এনসিডেন্ট বলা যেতে পারে অথবা তার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা যেটা তার ভবিষ্যৎ দেখতে পারে৷
- তোমার স্যারের সাথে দেখা করেছিলাম আজকে৷
- ওহ্
নীলা যথেষ্ট নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে বাবাকে কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না রাগ করলেও হবে না এই মুহুর্তে।
- তোমার স্যার আমাকে তোমার বিষয় নিয়ে কিছু বলেছে।
- কি?
- তুমি কি জানতে চাও না জানো আমি তোমাকে কি বলতে চাই?
- হ্যা জানি
- তার মানে বিষয়টা সত্যি তাইতো।
- হ্যা
- আমার এখন ইচ্ছে করছে কি জানো...
আমির সাহেব থামলেন৷ অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছে তবে তিনি তা পারছেন না৷ রাহেলা বেগম মেয়ের মুখের দিকে একবার আর স্বামীর মুখের দিকে একবার তাকাচ্ছেন৷ তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন না বিষয়টা কি? মনসুর কি তার মেয়ের সাথে খারাপ আচরণ করেছে? নাকি তার মেয়ের সর্বনাশ করেছে? ভাবতেই রাহেলা বেগমের গায়ের লোম গুলো দাড়িয়ে গেলো৷ রাহেলা সাহস করে আমির মোল্লা কে জিজ্ঞেস করলেন
- কি হয়েছে আমাকেও বলবে?
- যা হয়েছে সেটা তোমার মেয়ের কাছ থেকে পড়ে জেনে নিবে।
রাহেলা বেগম মেয়ের দিকে তাকালেন। নীলার মাঝে কোনো ভয়ভীতি তিনি বুঝতে পারছেন না৷
আমির সাহেব অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে মেয়েকে ডাকলেন
- নীলা
- হুমম
- যা হয়েছে ভুলে যাও এখন থেকে মনসুর এর সাথে তোমার সব রকম যোগাযোগ বন্ধ।
- কেনো?
- বেশি কথা বলবে না যেটা বলেছি সেটাই করবে আর যদি আমার কথা না শোনো তাহলে তোমাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দিতে এক মুহুর্তের জন্যও দেড়ি করবো না কথাটা কি বুঝেছো৷
নীলা অস্পষ্ট শব্দে মাথা নিচু করে কিছু বললো আমির সাহেব সেটা শুনতে পেলেন না৷
- আমি কিছু বলেছি বুঝেছো?
- হ্যা
- বেশ ঘরে যাও আর একটা লম্বা ঘুম দাও দেখবে সবকিছু ভুলে গিয়েছো৷ ওই মনসুর এর ব্যাপারে আর একটা কথাও আমাকে বলবে না৷
নীলা কথা বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করছে না৷ এখন কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই বাবা রেগে আছেন তাকে দেখে বোঝায় যাচ্ছে তিনি কখনোই এটা মেনে নিবেন না৷ যদি স্যারও আমাকে পছন্দ করতেন তাহলে হয়তো দুজনে দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়া যেতো৷ আচ্ছা স্যারকি তাকে পছন্দ করে না? করে হয়তো তবে সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে হয়তো রাজি হচ্ছেন না৷ আচ্ছা আমি কি পালিয়ে স্যারের কাছে চলে যাবো? আমরা বিয়ে করলে দোষ কোথায়? স্যার তো আমার থেকে মাত্র ৫ বছরের বড়ো। ৫ বছরের বড় কাউকে বিয়ে করা নিশ্চয় অন্যায় নয়। নীলার মাথাটা ধরছে ঘুমানো দরকার৷ অথচ তার চোখে কোনো ঘুম নেই৷ বাসার দারোয়ানকে দিয়ে গতকাল এক পাতা ক্লোরোন আনিয়ে রেখেছে। ঔষধটা নীলা খাবে খাবে করে আর খাওয়া হয়নি৷ বাবা বলেছে তার লম্বা ঘুমের দরকার নীলা একাধারে ১০টা ক্লোরোন খেয়ে ফেললো আসলেই তার প্রচুর ঘুমের প্রয়োজন৷ নীলা বিছানায় শুয়ে আছে চোখ দুটো ভেঙে আসছে তার যেনো ঘুমে জড়িয়ে এখনই এক অন্য জগতে চলে যাবে।
আমির সাহেব চেয়ারে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছেন রাহেলা বেগম বসে আছেন তার পাশে৷ মনসুর ছেলেটাকে আমির সাহেবের বেশ পছন্দ তবে তিনি তার হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দিতে পারেন না৷ মানসম্মানের কথা ভেবেই তিনি চাননা নীলা মনসুরকে ভালো বাসুক। মনসুর রহমান নীলার স্যার যদি বিষয়টা জানাজানি হয়ে যায় তখন হয়তো সাধারণ মানুষ আমির সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলবেন স্যারের সাথে মনে হয় আপনার মেয়ে অকাম করেছে তাই বিয়ে দিয়েছেন। আরও নানা বিষয় আছে সে রাজনৈতিক ঘরোয়ানার মানুষ অনেকদিক বিবেচনা করে তাকে পা ফেলতে হয় একটু থেকে একটু ভুল হলেই মানসম্মান নিয়ে টানাটানি৷
- রাহেলা আমার জন্য ফ্রিজ থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পামি নিয়ে আসো আর নীলার কাছে যাবে না ওকে কিছুক্ষণ একা থাকতে দাও৷
রাহেলা বেগম পাথরের মুর্তির মতো সেখান থেকে চলে গেলেন।
মনসুর রহমান বিছানায় শুয়ে আছেন৷ তার মাথায় প্রচন্ড রকমের ব্যাথা অনুভব করছেন মনে হচ্ছে কেউ যেনো সজোড়ে তার মাথায় লোহা দিয়ে বাড়ি মারছে৷ মনসুর রহমানের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে তার ঘুম পাচ্ছে তবে তিনি ঘুমুতে চান না মনের মাঝে এক অজানা ভয় ভীতি কাজ করছে৷ কেনো জানি মনে হচ্ছে আজকে যদি এখন তিনি ঘুমিয়ে পড়েন তাহলে আর কখনই জেগে উঠতে পারবেন না৷ মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসছে মনসুর এর কানে কেউ একজন তাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে মনে হচ্ছে
"মনসুর এই মনসুর শুনতে পারছো?
- কে! কে ডাকছে আমাকে?
- আমি চিনতে পারছো না আমায়?
- না আর আমি চিনতেও চাইনা তোমাকে।
- কি হলো রেগে যাচ্ছো কেনো?
- কিছুনা মাথা ব্যাথা করছে হয় সামনে আসো না হলে চলে যাও৷
- আমি তো আসতে পারবো না তুমি কি আমাকে দেখতে চাও?
- হ্যাঁ
- তাহলে তো তোমাকে আমাদের দেশে আসতে হবে।
- সেটা কিভাবে?
- তুমি চাইলে আমি তোমাকে নিয়ে আসবো তবে একটা কথা আছে।
- কি?
- এখানে আসলে যে আর ফিরে যেতে পারবে না।
- কি আছে তোমাদের দেশে?
- সব কিছুই আছে শুধু মৃত্যু নেই।
- মৃত্যু নেই?
- হ্যা মৃত্যু নেই তুমি যা খুশি করতে পারবে এখানে কি তুমি আসবে?
- ওখানে কি মাথা ব্যাথা হয়?
- না
- তাহলে আমাকে নিয়ে চলো সেখানে।
- সত্যিই তুমি আসবে তো?
- হ্যা আমি এই ব্যাথা থেকে মুক্তি পেতে চাই৷
- বেশ তাহলে আমার হাতটি ধরো।
- কোথায় তোমার হাত
- এই যে
মনসুর রহমানের দিকে একটা হাত আসলো হাত ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মনসুর রহমান হাতটি ধরলেন৷ মনে হচ্ছে কেউ যেনো তাকে শুণ্য ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে৷ মনসুর রহমান তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন তিনি কোথায় ভাসছেন৷ আশ্চর্য তিনি চোখ খুলতে পারছেন না শুধু ভেসেই চলেছেন৷
" মনসুর রহমান নীলাদের বাড়ির ছাদের রেলিঙের ডান পাশের কর্ণারে বসে আছেন৷ তার পাশে বসে আছে নীলা মনসুর রহমান নীলার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে। মেয়েটাকে আজ বেশ অপরুপ সুন্দর লাগছে৷ মনসুর রহমান ও নীলা দুজনেই নিচে তাকিয়ে দেখছে
"আমির সাহেব বেশ অধৈর্য হয়ে ছোটাছুটি করছে বাসার গেটের সামনে এম্বুলেন্স দাড়িয়ে আছে৷ রাহেলা বেগম সিড়ির সামনে কপালে হাত দিয়ে বসে আছেন তিনি কাঁদছেন। বাড়ি ভর্তি মানুষ জড়ো হয়ে আছে কিছু স্বাস্থ্য কর্মীকে দেখা গেলো একটা মেয়ে মানুষকে ধরে তাদের এম্বুলেন্স এ উঠাচ্ছে পিছন থেকে আমির সাহেব চেঁচাচ্ছে তাড়াতাড়ি করবার জন্য "
মনসুর রহমানের বেশ ইচ্ছা জাগছে একবার হোস্টেলে গিয়ে দেখে আসতে সেখানেও কি তাকে নিয়ে এমন বাড়াবাড়ি করছে নাকি কেও? চাইলেই যেতে পারেন তবে এই মুহুর্তে নীলাকে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না মেয়েটা নীচের দিকে তাকিয়ে আছে এক ভাবে মনে হচ্ছে তার মন খারাপ তবে তা দেখে বোঝার উপায় নেই এই দেশে যে দুঃখ, ব্যাথা, মৃত্যু বলে কোনো শব্দ নেই৷
সমাপ্ত
গল্পের শেষটা কাল্পনিক তাই বাস্তবকে টানার দরকার নেই৷ কোনো ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহবান জানাচ্ছি৷ যদি বুঝতে কোথাও সমস্যা হয় জানাবেন৷ অবশ্য মনোযোগ সহকারে পড়লে বুঝতে পারবেন৷ ধন্যবাদ
