স্বপ্ন পর্বঃ ২ লেখকঃ সিয়াম হোসেন

 


স্বপ্ন

পর্বঃ ২ 

লেখকঃ সিয়াম হোসেন 


মনসুর রহমান মাথার ব্যাথায় বিছানায় শুয়ে আছে৷ আজ তিনদিন ধরে তিনি এই মাথা ব্যাথ্যার সমস্যা ভুগছেন৷ প্রথম দিকে ব্যাথাটা হালকা থাকলেও আজকে বেশ চড়াও দিয়ে উঠছে৷ ডাক্তার দেখানো দরকার মাথায় হঠাৎ করে এতো ব্যাথা কিসের জন্য জানতে হবে৷ সাহেদ কে বলে ঔষুধ আনিয়ে নেওয়া যায় তবে আজ দু'দিন হয়ে যাচ্ছে সাহেদ রুমে নেই৷ গত পরশু রাতে খাবার আনবে বলে বেড়িয়েছে এখনো ফিরেনি৷ মনসুর রহমান সেই বিষয় নিয়ে চিন্তাও করতে পারছেন না মাথা ব্যাথার জন্য৷ ছেলেটার কিছু হয়নি তো? মনসুর রহমান একটা বিষয় খেয়াল করে দেখেছেন আজ দু'দিন যাবত তিনি এক প্রকার স্বপ্ন দেখছেন কেউ তাকে ডাকছে মেয়েলি কন্ঠে কিন্তু মনসুর রহমান বুঝতে পারছেন না৷ সব মানুষেরই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ধারণ ক্ষমতা থাকে সেটা বেশি হয়ে গেলে কেউই ঠিক থাকতে পারে না প্রচুর মাথা ব্যাথার কারণে মনসুর রহমান জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। 


"

- মনসুর......

-......

- মনসুর শুনতে পারছো আমায়? 

- কে? 

- আমি 

- আমি কে? কে তুমি কোথা থেকে কথা বলছো? 

- এইযে আমি তোমার সামনে দাড়িয়ে।  

- কোথায় আমি তো দেখতে পারছি না। 

- কিভাবে পারবে তুমি যে ঘুমিয়ে আছো। 

- ঘুমিয়ে আছি? 

- হ্যাঁ 

- তাহলে তুমি আমার সাথে কথা বলছো কিভাবে। 

- কারণ তুমি চাইছো সে জন্য৷ 

- আমি চাইছি? কিভাবে?  

- সেটা নিজের মনকে জিজ্ঞেস করো। 

- দেখো তুমি যেই হয়ে থাকো আমার সামনে আসো। 

- আসবো একদিন ঠিকই আসবো সেদিন আমায় চিনতে পারবে তো? 

- কি বলতে চাইছো তুমি? 

- আমি সবসময়ই তোমার পাশে আছি এবং সারাজীবন থাকবো যদি তুমি আমাকে খুজে পা-ও তো। 

- বুঝতে পারছি না তুমি কি বলছো? 

- তুমি এখন ঘুমাও তোমার ঘুমের দরকার ঘুম থেকে উঠে দেখবে তুমি সুস্থ।  

কথাগুলো দূরে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে থাকে৷ 

মনসুর রহমান কপালে ঠান্ডা কিছু অনুভব করছেন৷ তিনি চোখ খুলতে চাইছেন পারছেন না কেউ যেনো তার চোখ গুলো বেধে দিয়েছে৷ মুখ দিয়ে গোঙানির মতো আওয়াজ বের করে জিজ্ঞেস করলেন 

- কে? 

- আমি সাহেদ

মনসুর রহমান আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলেন না৷ 


নীলা খাবার টেবিলে বসে আছে৷ তার চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গিয়েছে রাতে ঘুম হয়নি সে জন্যই৷ স্যার পড়াতে আসছে না কেনো এটা নিয়ে চিন্তা করতে করতে নীলা অনেকটা ভেঙে পড়েছেন৷ মা'কে বলেছেন স্যার পড়াতে আসছে না সেই সাথে ফোনও ধরছে না এটা যেনো বাবাকে বলে৷ রাহেলা বেগম বলবে বলবে ভেবে আর বলা হয়ে উঠে না৷ 

- নীলা 

- হ্যা বাবা 

- কি হয়েছে খাচ্ছো না কেনো? 

- কিছু না বাবা 

- রাহেলা কি হয়েছে তোমার মেয়ের? দেখে তো মনে হয় সারারাত ঘুমায়নি।

- জানি না আমার মনে হয় ওকে ডাক্তার দেখানো উচিত ঠিক মতো খাচ্ছেও না আজ দু'দিন।  

- আমাকে আগে বলোনি কেনো? 

রাহেলা বেগম কিছুটা ভয় পেলেন কথা শুনে৷ লোকটাকে বোঝা বড় মুশকিল কোনটা হেসে বলেন আর কোনটা রেগে সেটা অনেক সময় বুঝতে তার কষ্ট হয়ে যায়৷ তবে এখন বেশ রেগে আছেন বোঝা যাচ্ছে। 

- কথা বলছো না কেনো? 

- তুমি সবসময় ব্যাস্ত থাকো তাই বলিনি। 

- তো কি হয়েছে বলবে না! মেয়ে না খেয়ে আছে আর কেনো খাচ্ছে সেটার কারণ জিজ্ঞেস করোনি? 

রাহেলা বেগম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন আমির সাহেবের দিকে৷ লোকটা আজ এতো রেগে কথা বলছেন কেনো? জিজ্ঞাসা করে দেখবেন কোনো ঝামেলা হয়েছে কিনা? না এতে হয়তো আরও রেগে যেতে পারেন৷ রাহেলা বেগমের চুপ থাকা দেখে আমির মোল্লা আরও বিরক্ত হলেন৷ ইচ্ছে করছে বেশ কঠিন কিছু তাকে শুনিয়ে দেই কিন্তু পারছেন না সামনে মেয়ে বসে আছে৷ তিনি মেয়ের সামনে তার মায়ের মন খারাপ করতে পারেন না৷ 

- বলো কি সমস্যা তোমার? 

- কিছু না বাবা৷ 

- তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে? 

- স্যার তো আজ ৩ দিন ধরে পড়াতে আসেন না৷

- কেনো? 

- জানিনা সেদিন পড়ানোর শেষে বললেন তার মাথা ব্যাথা করছে এর পরদিন থেকে আর পড়াতে আসেনি ফোন দিলেও ধরছে না আর এখন তো তার ফোনই বন্ধ বলছে। 

- তুমি তাকে কিছু বলেছো? 

নীলা চুপ করে আছে সে কিছু বলতে চায় না৷ বাবার মেজাজ এখন তেমন ভালো না যদি বলতে গিয়ে মুখ থেকে সত্যিটা বের হয়ে যায় তাহলে সমস্যায় পড়তে হবে তাকে৷ 

- খাবার শেষ করো আমি দেখবো বিষয়টা৷ 

নীলা খাবার খেয়ে রুমে চলে আসে৷ কিছুটা হলেও মনে সস্তি বাবা যখন বলেছে বিষয়টা সে দেখবে তার মানে নিশ্চয় স্যারের সাথে দেখা করবেন তিনি৷ আচ্ছা বাবার সাথে গিয়ে স্যার কোথায় থাকেন সেটা দেখে আসলে কেমন হয়? না এতো কৌতুহল দেখানো ঠিক হবে না তাছাড়া আমার মন বলছে স্যার আমার কাছে অবশ্যই ফিরে আসবে সে না এসেও কোনো উপায় নেই৷ নীলা প্রচুর ক্লান্তি অনুভব করছে। কাল সারারাত ঘুম হয়নি সে জন্য হয়তো৷ নীলার রাত জাগার অভ্যাস নেই অথচ গত তিন রাত সে ভালো মতো ঘুমাতেও পারেনি৷ শরীরের সমস্ত জীবিত কোষ যেনো ক্লান্তির কারণে থেমে যাচ্ছে নীলার ঘুম পাচ্ছে প্রচুর ঘুম পাচ্ছে তার৷ বিছানায় শুয়ে পড়তেই নীলা ঘুমিয়ে পড়ে৷ 


" 

- নীলা.. 

- হুমম 

- ঘুমিয়েছো? 

- না তোমার অপেক্ষায় আছি কোথায় ছিলে? 

- তোমার পাশেই তো আছি৷ 

- কোথায় আমি তো দেখছি না৷ 

- কিভাবে দেখবে তুমি যে ঘুমিয়ে। 

- তাহলে আমি তোমাকে শুনতে পারছি কিভাবে? 

- শুধু কি প্রশ্নই করবে? তোমাকে দেখতে দাও একটা কথাও বলবে না৷ 

নীলা চোখ খুলে দেখতে চাইছে পারছে না৷ এক অদ্ভুত শক্তি যেনো তাকে চোখ খুলতে দিচ্ছে না৷ 


মনসুর রহমান বেশ ভোরে ঘুম থেকে উঠেছেন। এখন তার মাথায় কোনো ব্যাথা নেই তিনি পুরোপুরি সুস্থ। তার পাশের চৌকিতে সাহেদ ঘুমিয়ে আছে দেখে মনে হচ্ছে সে গভীর ঘুমে রয়েছেন৷ মনসুর রহমানের কাল রাতের কথা মনে পড়ছে কেউ একজন বলেছিলো সকালেই তার মাথা ব্যাথা ঠিক হয়ে যাবে হয়েছেও তাই৷ এটাও কি সম্ভব? তিনি স্বপ্নে একজনের সাথে কথা বলেছেন সে বলেছিলো ঠিক হয়ে যাবে আর ঠিক হয়ে গেলো কিভাবে? এটা হয়তো তার মনের ভুল অনেক সময় ভালোমতো ঘুমের কারনে মাথা ব্যাথা ঠিক হয়ে যায় তার ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে৷ মনসুর রহমানের কানে নিচ থেকে অনেক মানুষের আওয়াজ ভেসে আসছে৷ ঢাকা শহর জেগে উঠেছে অথচ এতো সকালে এতো কোলাহল কখনই হয়না ঢাকার মতো শহরে৷ বাইরের থেকে সুর্যের আলো আসছে জানালা দিয়ে তার মানে তিনি ভোরে ঘুম থেকে উঠেন নি। অথচ কেনো জানি মনে হচ্ছে মাত্রই সকাল হয়েছে৷ মোবাইলটা হাতে নিলেন সময় দেখা দরকার কয়টা বাজে। মনসুর রহমানের ফোনে চার্জ নেই তিনি সময় দেখতে পারছেন না৷ তিনি নিজের উপর বিরক্ত হচ্ছেন অথচ এটা হবার কথা নয় মাথা ব্যাথার কারণে চার্জ না দেওয়ায় ফোন বন্ধ হয়ে গিয়েছে স্বাভাবিক৷ তাও তিনি বিরক্ত হচ্ছেন। 

দরজার বেশ স'জোরে কেউ ধাক্কা দিচ্ছেন৷ 

মনসুর রহমান গলা বাড়িয়ে বললেন 

- কে?  

কোনো উত্তর নেই দরজায় ধাক্কা দিয়েই যাচ্ছে৷ মনসুর রহমান রাগছেন। দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে অথচ উত্তর নেই তার উপর সকাল করে কে তাকে ডাকতে আসবে৷ বিরক্তিকর ভাব নিয়ে দরজা খুললেন৷ 

হ্যাংলা পাতলা করে এক মধ্যবয়সী মানুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ পড়নে সাদা শার্ট সেটাও ইন করে পড়েছেন দেখতে তেমন ভালো লাগছে না৷ মনসুর রহমান লোকটাকে চেনেন নাম বদরুল আমির সাহেবের এসিস্টেন্ট। কিন্তু তিনি এখানে কি করছেন? 

- বদরুল সাহেব আপনি এখন? 

- স্যার আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন নিচে গাড়িতে অপেক্ষা করছে। 

- নিচে কেনো তাকে এখানে আসতে বলুন৷ 

বদরুল কপালের ভ্রু কুঁচকিয়ে তাকালেন এই তাকানোর মানে মনসুর রহমান জানেন৷ কথাটা বলা মনে হয় উচিত হয়নি তিনি একজন সম্মানি ব্যাক্তি হয়তো এখানে আসতে লজ্জা পাচ্ছেন। 

- বদরুল সাহেব কয়টা বাজে? 

- ১১'টা! কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি আসুন। 

- ঠিক আছে আপনি এগোন আমি আসছি৷ 

মনসুর রহমান বিস্মিত হচ্ছেন বেলা ১১ টা বাজে অথচ তিনি ভেবেছিলেন আজ ভোরে উঠেছেন৷ আমির সাহেবকে অপেক্ষা করানো ঠিক হবে না৷ মনসুর রহমান কোনো ভাবে হাত মুখ ধুয়ে নিচে নামলেন৷ 

- আসসালামু আলাইকুম স্যার 

- ওয়ালাইকুম আসসালাম গাড়িতে ওঠো যেতে যেতে কথা হবে৷ 

মনসুর গাড়িতে উঠলেন৷ 

- কিছু কি হয়েছে স্যার? 

মনসুর রহমান কিছুটা ভীতু আমির মোল্লা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? নীলা কি কোনো উল্টা পাল্টা কিছু বলেছে? 

- নীলা বললো তুমি নাকি তাকে পড়াতে যাচ্ছো না। 

- একটু সমস্যা হয়েছিলো মাথা ব্যাথা।  

- ও এখন কি ঠিক আছো? ডাক্তার দেখিয়েছো?

- না তবে এখন ঠিক আছি স্যার। 

- এই কথায় কথায় স্যার বলবা না তো তোমাকে কতবার বলেছি আংকেল বা কাকা যেইটা ভালো লাগে বলবা। 

- আপনি একজন সম্মানি ব্যাক্তি আর সম্মানি ব্যাক্তিকে সম্মান করে স্যার ডাকাটাই উত্তম।  

আমির সাহেব কিছু বললেন না ভিতরে ভিতরে কিছুটা খুশি হলেন৷ ছেলেটাকে তার খুবই পছন্দ বিশেষ করে তার কথা গুলো ভালো লাগে৷ 

- তাহলে কি আজকে পড়াতে যাবে? 

- না 

আমির সাহেব অবাক হলেন সরাসরি না বলার জন্য৷ 

- কেনো তুমি তো সুস্থ 

- হ্যা তবে নীলাকে নিয়ে একটু সমস্যা আছে 

- কি সমস্যা?  

- সে আমাকে সরাসরি প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে যেটা আমি আশা করছি না আপনি বিষয়টা বুঝতে পারছেন৷ তাই আমি আর ও'কে পড়াতে যেতে পারবো না। 

আমির সাহেব অবাক হবার মতো মনসুর এর দিকে তাকিয়ে আছে৷ এই ছেলেটা সরাসরি তার মেয়েকে অপবাদ দিচ্ছে তারই পাশে বসে মন চাচ্ছে...আমির সাহেব নিজেকে সামলালেন 

- তুমি কি সত্যি বলছো? 

- জ্বী নীলাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন তবে একটা অনুরোধ তাকে কড়া কিছু বলবেন না পরে হয়তো কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বসবে৷ ছোট মানুষ আবেগ বেশি। 

আমির মোল্লা স্থির হয়ে বসে আছেন৷ জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিচ্ছেন৷ 

- মনসুর 

- জ্বী স্যার 

- আমি প্রায় চলে এসেছি এখন তোমাকে নামতে হবে দেখে মনে হচ্ছে সকাল থেকে কিছু খাওনি টাকাটা রাখো নাস্তা করে নিও।  

মনসুর রহমান মাথা নিচু করে গাড়ি থেকে নেমে গেলেন৷ নিজের কাছে খারাপ লাগছে নীলার বিষয়টা বলা কি ঠিক হয়েছে? না বললে কি হতো না অন্য কোনো যুক্তিও তো দেওয়া যেতো। কিন্তু কি? মনসুর রহমান তেমন একটা মিথ্যা কথা বলতে পারেন না। মিথ্যা কথা বলতে গেলেই কথা আটকে যায় তার৷ 


নীলা এখনও বিছানায় ঘুমিয়ে আছে৷ ঘড়ির কাটায় ১২ঃ৩০ টা বাজে রাহেলা বেগম নীলাকে ডেকে তুললেন তাকে দেখে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে। 

- কি হয়েছে মা? 

- তোর বাবা তোকে ডাকছে তাকে দেখে কিছুটা রাগীও মনে হচ্ছে তাড়াতাড়ি উঠে পর।  

নীলা দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে বসে৷ সে এর আগে মা'কে কখনো এতটা অস্থির হতে দেখেনি৷ আর বাবা তাকে ডাকার পিছনে কি কারণ থাকে পারে? বাবা কি স্যারের সাথে দেখা করেছেন? আর স্যার তার সম্পর্কে বাবাকে বলে দিয়েছেন স্যারকে বলা কথা গুলো? হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে উত্তর পেতে হলে বাবার সাথে দেখা করতে হবে৷ 


চলবে....


আশানুরূপ মতামত আশা করছি? কমেন্টে নেক্সট লিখে কমেন্ট করবেন না পরবর্তী পর্ব আমি এমনিতেই লিখবো৷ তবে তার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। ধন্যবাদ❤️

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post