স্বপ্ন লেখকঃ সিয়াম হোসেন


 স্যার অনেক দিন ধরে ভাবছি আপনাকে একটা কথা বলবো তবে সাহস করে বলতে পারিনি৷ কিন্তু আপনাকে না বলেও থাকতে পারছি না কিন্তু কথা গুলো বলার আমার জন্য বেশ জরুরি"


নীলা এইটুকু বলে থামলো৷ মনসুর রহমান নীলার দিকে মাথা উঁচু করে তাকালেন৷ মেয়েটার মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ তিনি বুঝতে পারছেন। কি এমন কথা যেটা নীলা তাকে বলতে ভয় পাচ্ছে? বিষয়টা নিয়ে মনসুর মাথা ঘামালেন না কারণটা তার জানা নীলা মেয়েটা কিছুক্ষণের মধ্যই সেটা পরিষ্কার করবে। 

- স্যার আমি আপনাকে কিছু বলছি আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন? 

- হ্যা শুনছি বলো

- আগে বলুন রাগ করবেন না। 

- আচ্ছা করবো না 

- বাবাকেও বলবেন না 

- আচ্ছা 

- স্যার আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। 

নীলা কথাটা বলে মুখটা নিচু করে রইলো টেবিলের দিকে৷ 

- ও আচ্ছা.. 

মনসুর রহমানের ' ও আচ্ছা' শব্দটা শুনে নীলা বেশ বিস্মিত হলো৷ স্যার কি বুঝতে পারছে না আমি তাকে কি বোঝাতে চাইছি? 

- স্যার আপনি কি শুনেছেন? 

- হ্যা 

- কিছু বলবেন না? 

- কি বলবো? তুমি আমাকে পছন্দ করো এটা তো আমার জন্য সু সংবাদ। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার স্বার্থকতা যে তার ছাত্রী তাকে পছন্দ করে ধন্যবাদ নীলা। 

নীলা এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো৷ স্যারের কথা গুলো তাকে বেশ হতাশ করেছে৷ আচ্ছা এই লোকটা কি বুঝতে পারছে না তাকে আমার ভালো লাগে মানে আমি তাকে ভালোবাসি? 

- স্যার.. 

- হুমম 

- আপনি বুঝতে পারছেন না কেনো আমি আপনাকে ভালোবাসি। 

মনসুর রহমান এবার থমকে বসলেন৷ কথাটা তার হজম করতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছে৷ 

- কি হলো স্যার? 

- কিছুনা আমি ঠিক আছি। 

মনসুর বিষয়টাকে কিছুটা উড়িয়ে দেবার মতো করে বসে রইলেন৷ নীলা নিজের পড়া করা বাদ দিয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে৷ নীলার স্যার দেখতে বেশ সুদর্শন যুবক। চোখে একটা গোল ফ্রেমের বড় চশমা মুখে হালকা চাপ দাড়ি সেই সাথে মাথার চুল গুলোও বেশ সুন্দর ভাবে পরিপাটি করে রাখা সব মিলিয়ে স্যারকে দেখতে বেশ সুদর্শন লাগে৷ এই স্যারকে নীলার প্রথম দিন থেকেই পছন্দ। মনসুর রহমান খেয়াল করে দেখলেন নীলা পড়া বাদ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে৷ মনসুর রহমান এতে কিছুটা ইতস্ত বোধ করছেন৷ 

- নীলা

- জ্বী স্যার

- আমি জানি তোমার মনের মাঝে কি চলছে তবে দেখো এটা অন্যায়। 

- অন্যায় হবে কেনো? একজন ছাত্রী কি তার শিক্ষক কে ভালোবাসতে পারে না? 

- নীলা তুমি মাত্র ইন্টার ১ম বর্ষে পড়ো তোমার বয়স অল্প এই বয়সে মন বেশ উড়ু উড়ু থাকে তুমি এখন সেটা বুঝতে পারবে না যখন বড় হবে তখন ঠিকই বুঝতে পারবে৷ 

নীলা কিছু বলতে যাবে তার আগেই রাহেলা বেগম চা হাতে ঘরে প্রবেশ করলেন৷ তিনি আজ জাম কালারের শাড়ী পড়েন সেই সাথে মেসিং করে ব্লাউজ সব মিলিয়ে আজ তাকে দেখতে বেশ অপরূপ লাগছে৷ মনসুর রহমানের এই মহিলাকে বেশ ভালো লাগে তার বয়সের সাথে যেনো যৌবন আরও তাজা হচ্ছে৷ বেশ মিশুক প্রকৃতির মানুষ একটা। বড়লোক ঘরের বউ হলেও তার মাঝে অহংকার তেমন একটা নেই বলা চলে৷ রোজ নীলাকে পড়ানোর সময় এক কাপ চা সেই সাথে দু'টো টোজ বিস্কুট নিয়ে তাকে দিয়ে যাবেন৷ মনসুর রহমান এর তেমন চা-য়ের নেশা না থাকলেও নীলাকে পড়াতে আসার পর রাহেলা বেগমের হাতের চা না খেলে যেনো সেই দিনটাই আর ভালো কাটে না মনসুর এর৷ 

- মনসুর ভালো আছো? 

- জ্বী আন্টি আপনি ভালো আছেন? 

- হ্যা নীলা ঠিক মতো পড়ছে তো? 

- হ্যা 

- আচ্ছা তুমি চা শেষ করো আমি কাজ শেষ করে এসে নিয়ে যাবো। 

রাহেলা বেগম ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন৷ নীলা মনসুর এর দিকে তাকিয়ে আছে। সে কিভাবে তার স্যাকে বোঝাবে সে ছোট না সব কিছু বোঝার মতো তার যথেষ্ট বুদ্ধি আছে৷ নীলা কিছু একটা বলবে তবে সাহসে কুলাচ্ছে না যে কোনো সময় মা চলে আসতে পারে এই ভয়ে৷ মনসুর রহমান চা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন।  

- নীলা আজকে আর পড়াতে পারবো না মাথাটা বেশ ধরেছে।  

- কিন্তু স্যার আমার একটা প্রশ্নের উত্তর জানা বাকি। 

- কি প্রশ্ন? 

- ওইযে ছাত্রী আর শিক্ষক ভালোবাসলে দোষটা কোথায়? 

মনসুর রহমান উত্তর দেবার প্রয়োজন মনে করলেন না। নীলাদের বাসা থেকে বের হয়ে বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে রাস্তা হাঁটছেন।  


নীলা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে স্যারের চলে যাওয়া দেখছে যতদূর পর্যন্ত দেখা যায় দাঁড়িয়ে থাকে নীলা৷ সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না আজ তার মনের কথাটা স্যারকে বলে দিয়েছে৷ আচ্ছা স্যার কি সত্যিই আমাকে পছন্দ করে না?


মনসুর রহমান নিজের হোস্টেলে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়লেন মাথাটা আসলেই হঠাৎ করে প্রচন্ড ব্যাথা করছে৷ সাহেদ রুমে ঢুকে দেখলো মনসুর রহমান বিছানায় শুয়ে আছেন। 

- কি ব্যাপর মনসুর অবেলা করে শুয়ে আছো যে? 

- কিছুনা সাহেদ একটু মাথাটা ধরেছে তাই শুয়ে আছি।  

- আচ্ছা৷ 

সাহেদ মনসুর রহমান এর রুমমেট৷ সাহেদ ছেলেটাকে মনসুর রহমানের বেশ ভালো লাগে৷ সাহেদ দেখতে তেমন সুন্দর না হলেও মুখে এক মায়াবী ভাব আছে যেটা সকল ছেলেদের মাঝে থাকে না সেই সাথে সে খুব মিষ্টিভাষী প্রয়োজন ছাড়া তেমন কারও সাথে কথা বলেনা৷ সাহেদের আর একটা দিক তার কাছে বেশ ভালো লাগে সে বেশ ধর্ম ভীরু৷ মনসুর রহমান এর আগে যেমন নামাজের প্রতি অনিহা ছিলেন সাহেদ এর সাথে থাকতে থাকতে সেটা বদলে গিয়েছে। মনসুর রহমান কে নীলার বিষয়টা বেশ ভাবিয়ে তুলছে৷ মেয়েটা তাকে ভালোবাসে! এটা ঠিক না সে তার শিক্ষক তাছাড়া তার বাবা ঢাকা সিটির মেয়র নাম আমির মোল্লা। আর সে এইবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল সেমিস্টারের পরিক্ষা দিবে সামনের মাসে৷ নীলার বাবার সাথে পরিচয়টা হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। মনসুর রহমান বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারেন এটা তার এক বিশেষ গুন৷ এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার মাধ্যমেই আমির মোল্লার সাথে তার পরিচয়টা হয়েছিলো সেখানে থেকে ভালো পরিচয়। মনসুর রহমান ভালো ছাত্র এবং সেই সাথে ব্যবহার আচার ভালো হবার কারণেই আমির মোল্লা তার মেয়ে নীলাকে পড়াতে বলায় মনসুর না করতে পারেনি৷ 


রাত বাড়ছে নীলা বিছানায় শুয়ে আছে তবে তার ঘুম আসছে না৷ কেনো আসছে না সেটাও তার অজানা৷ চোখ বন্ধ করলেই সে তার স্যারকে দেখতে পারছে যে তার স্যার আর তাকে পড়াতে আসছেন না৷ নীলার মন এটা মানতে পারছে না সে এমনটা হোক চায় না। সত্যিই কি স্যার পড়াতে আসবেন না? না এটা শুধুই তার মনের কল্পনা আর কল্পনা সবসময়ই সত্যি হয়না তাছাড়া সে তো ভুল কিছু বলেনি স্যারকে তার আসলেই অনেক ভালো লাগে৷ একজন মানুষকে ভালোবাসাটা তো আর অন্যায় কিছু না৷ নীলার চোখ জড়িয়ে আসছে বেশ ঘুম পাচ্ছে তার চোখটা মৃদু বন্ধ হতেই তার ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। চোখের পাতা মৃদু মৃদু কাঁপছে নীলা স্বপ্ন দেখছে


" রূপা বিছানায় শুয়ে আছে তার মাথার কাছেই তার স্যার চেয়ার টেনে বসে তার মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। লোকটার চোখে আজ চশমা নেই চশমা ছাড়া যেনো তাকে আরও সুন্দর লাগছে৷ 

- স্যার

- হুমম 

- কি দেখেন ওমন করে তাকিয়ে। 

- চুপ কথা বলোনা দেখতে দাও। 

- আসুন না আমার পাশে শুয়ে থাকবেন। 

- আপনি নয় শুধু তুমি। 

- ইশশ লজ্জা লাগে তো 

- কথাগুলো বলার সময় লজ্জা কোথায় ছিলো? 

রূপা তার স্যারের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে৷ এই চোখ গুলো তাকে কাছে টানছে তাকে আরও নিজের করে নিতে চায় সে চোখ গুলো৷ নীলা তার ঠোঁট দু'টি আলতো করে স্যার ঠোঁটের সাথে মিশিয়ে দিলো৷ 

দূর থেকে বেশ মানুষজনের আওয়াজ আসছে। নীলার ঘুম ভেঙে যায়৷ সকাল হয়ে গিয়েছে৷ নীলা এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলো এতক্ষণ স্বপ্নের কথা ভাবতেই লজ্জার ভাব চলে আসে মুখে। ইশশ স্বপ্নটা যদি আসলেই সত্যি হতো৷ এমন স্বপ্নের মাঝে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় সে বেশ বিরক্ত। নিচ থেকে মানুষের আওয়াজ ভেসে আসছে৷ সম্ভবত বাবার সাথে লোকজন দেখা করতে এসেছে৷ 


দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো নীলা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে গেটের দিকে তাকিয়ে আছে আর কিছুক্ষণ বাদে স্যার আসবে তারই অপেক্ষা করছে সে৷ স্যার পড়ান বিকেল ৪ টায় আর এখন বাজে সাড়ে ৩ টা। স্যার আসতে এখনও আধা ঘন্টা বাকি তবুও নীলা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে৷ সময় বাড়ার সাথে সাথে নীলার মনের মাঝে এক অজানা ভয় ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে৷ সময়টা যত এগিয়ে আসছে তার ভয়ও ততটা বাড়ছে এই ভয়ের উৎস নীলার অজানা৷ সে নিজেও জানে না তার মনে আজ এতো ভয়ের জন্ম নিচ্ছে কেনো৷ ৪ টা বাজতে আর ২ মিনিট বাকি নীলা এখনও বেলকনিতে দাঁড়িয়ে গেটের দিকে তাকিয়ে আছে স্যারের কোনো চিহ্ন নেই৷ স্যার আজকে আসতে এতো দেড়ি করছে কেনো? সময়ের সাথে নীলার ভয়ও বাড়ছে কেনো জানি মনে হচ্ছে স্যার আর আজকে পড়াতে আসবে না৷ তাহলে কি কালকের কল্পনা সত্যি হয়ে যাবে? না এটা হতে পারে না স্যারকে একটা ফোন দেওয়া উচিত হয়তো রাস্তায় জ্যামে আটকা পড়ছে৷ 

ফোন রিং হচ্ছে অথচ তুলছে না। নীলার ভয়টা যেনো সত্যিই হতে চলেছে। আচ্ছা স্যার তো কাল বলেছিলো তার মাথা ব্যাথা সেটা কি ঠিক হয়নি? ফোন না ধরায় নীলা আরও চিন্তিত হয়ে পড়েছে৷ একবার ভাবলো সে স্যারকে গিয়ে দেখে আসবে কিন্তু স্যার কোন হোস্টেলে থাকে সেটা সে কিছুতেই মনে করতে পারলো না৷ বাবাকে কি জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে? না এতে তিনি অনেক প্রশ্ন করবেন৷ নানা রকম চিন্তা ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে৷ এক প্রকার মনকে শান্তনা দিয়ে মুখ কালো করে নিজের রুমে বসে আছে নীলা৷ নীলার মনে মাঝে অস্থিরতা কাজ করছে স্যার ফোন না ধরায় সেটা আরও বাড়ছে এই বুঝি স্যার আর নেই.....


চলবে.....

#স্বপ্ন

পর্ব ১

লেখকঃ সিয়াম হোসেন

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post