প্রাক্তন লেখকঃ সিয়াম হোসেন পর্বঃ ৫ (শেষ)


 প্রাক্তন

লেখকঃ সিয়াম হোসেন 

পর্বঃ ৫ (শেষ)


আজ একটু তাড়াতাড়ি করে বাসায় চলে আসায় মিলিকে দেখলাম সে বেশ কিছুটা অবাক হয়ে আছে৷ বুঝে উঠতে পারছি না তার অবাক হবার কারণটা৷ 

- তোমার কি জ্বর আবারও এসেছে নাকি না শরীর খারাপ করছে? 

- কেনো শরীর খারাপ করতে যাবে কেনো? 

- তাহলে যে আজ একটু তাড়াতাড়ি করে বাসায় ফিরলে? 

- তেমন কিছুনা স্যার ছুটি দিয়ে দিলেন কিন্তু কেনো সেটার কারণ বলেনি। 

- ওহ আচ্ছা যাও রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও৷ 

- হুমম তুমি একটু রুমে আসো

মিলিও আমার পিছু পিছু রুমে চলে আসলো। 

- হ্যা বলে কি হয়েছে? 

- বলছি যেহেতু আজকে একটু তাড়াতাড়ি বাসায় চলে এসেছি তাই ভাবছিলাম তোমাকে নিয়ে একটু বাহিরে ঘুরতে বের হতে চাচ্ছিলাম যদি তোমার আপত্তি না থাকে৷ আর রাতের খাবারটা বাহিরেই খাবো কি বলো?  

- কিন্তু আমি যে যেতে পারবো না শুধু আমি না তুমিও যেতে পারবে না৷ 

মিলির হুট করে না করে দেওয়াটা বেশ অবাক করছে আমাকে৷ বিয়ের পরে মেয়েটাকে কখনও নিজের ইচ্ছায় বাহিরে ঘুরতে নিয়ে যায়নি যখনই গিয়েছি হয়তো ওর জেদের বসে নয়তো কোনো দরকারে৷ এই প্রথম তাকে নিজে থেকে বললাম আর সে কিনা আমাকে হুট করেই না করে দিলো।

- এমন হুট করে না করে দিলে?  

- দেখো মন খারাপ করো না আমি না করতাম না৷ তোমার কথাটা শুনে আমি যে কতটা খুশি হয়েছি তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না কেননা এই প্রথমবার বললে নিজ থেকে৷ তবে একটু সমস্যা হয়ে গিয়েছে আজ মা বাবা আসবে বলেছেন। এতোক্ষণে তো চলেও আসার কথা তাদের 

- আরে বিয়াই সাহেব যে আসুন আসুন আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম ( নিচ থেকে বাবার গলা) 

- তারা চলে এসেছেন তুমি এক কাজ করো ফ্রেশ হয়ে নিচে আসো আমি ততক্ষণে খাবারের ব্যবস্থা করি। 


এইটা কোনো কথা হলো ধূর কোথায় ভাবলাম ওর সাথে ঘুরবো আর অসুর ছি ছি কি সব বলছি শশুর এসে ভেস্তে দিলো৷ 

- কিরে মা সিয়াম কোথায় অফিস থেকে কি আসেনি এখনও? 

- না বাবা এসেছে রুমে ফ্রেশ হচ্ছে এখনই চলে আসবে। 

- আসবে না এসে গেছি৷ 

- এইতো কেমন আছো বাবা? 

- এইতো ভালো আছি আপনি কেমন আছেন? আম্মা আপনার শরীরটা ঠিক আছে তো? 

- হ্যা বাবা আমরা দুজনেই ভালো আছি৷ 

- যদি রাগ না করেন একটা কথা বলি? আমি আর মিলি একটু বাহিরে যেতে চেয়েছিলাম আর রাতের খাবারটা বাহিরেই খাবো ভাবছি আসলে সবসময় অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকি তেমন একটা সময় পাওয়া হয়না তো তাই যদি কিছু মনে না করেন৷ 

পরিবেশটা কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে৷ শুনশান নিরবতা যেনো আমার কথাগুলে ঝড়েরবেগে তাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিয়েছে৷ মা বাবা তো আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রয়েছে৷ 

মিলি হাতে আস্তে করে চিমটি কেটে মাথাটা কানের কাছে নিয়ে এসে বললো 

" পাগল হয়ে গেলে নাকি কি সব বলছো মাথা ঠিক আছে তো" 

আমি মিলির কথার কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলাম না৷ হঠাৎ করেই শশুর আব্বা হো হো করে হেসে উঠলেন৷ 

- ঠিক আছে বাবা তোমরা যখন ঠিক করেই ফেলেছো যাও আমরা নাহয় বিয়াই সাহেবের সাথে গল্প করি৷ 

- না বাবা আসলে.. 

- থাক মা আমাদের নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না তোরা যা।  


মিলি আর আমি রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটছি৷ এ এক অন্যরকম অনুভূতি।  

- আমার ইচ্ছে করছে কি জানো তোমার গলাটা চেপে ধরে রাখি মা বাবার সামনে হুট করে ওমন ভাবে বললে কেনো তাঁরা কি না কি ভাবছে৷ 

- যা ভাবে ভাবুক সেটা আমার দেখার বিষয় না এখন তুমি আর আমি কিছুক্ষণ পায়ে হেটে ঘুরবো তারপর রাতের খাবার শেষ করে তবেই বাসায় ফিরবো৷ 

দুজনে রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটছি৷ 

- জানো রাতের বেলায় এক সাথে পাশাপাশি হাত ধরে হাটলে দুজনের মাঝে ভালোবাসাটা বৃদ্ধি পায়৷ 

- থাক আমার ওতো জানতে হবে না যেই না ভালোবাসেন আমারে হু৷ 

- ধুর হাঁটবো না আর যা-ও।  

- হইছে আর রাগ করতে হবে না হাঁটেন।  


রাত ৯ টা বাজে মিলি আর আমি দুজনেই রাস্তার এক ল্যাম্পপোস্টের বাতির নিচে বসে আছি৷ শুধু আমরা দুজন বললেই ভুল হবে আসে পাশে আরও অনেক প্রেমিক প্রেমিকা বসে রয়েছে৷ নিজেদের না বলা কথা একে অপরের সাথে শেয়ার করছে৷ 

- বলছি এখানেই বসে থাকবে না বাসায়ও যেতে হবে ওই দিকে মা বাবা অপেক্ষা করছে৷ 

- হুম চলো আগে কিছু খেয়ে নেওয়া যাক৷ 


রেস্টুরেন্টে বসে মিলি আর আমি খাবার উপভোগ করছি৷ হঠাৎ করেই ফোনটা বেজে উঠলো হাতে নিয়ে দেখলাম নীলিমা৷ ধরলাম না ফোনটা সাইলেন্ট করে পকেটে ভরে রাখলাম৷ এই মুহুর্তে তার সাথে কথা বলে মিলির সাথে আমার কাটানো সময়টাকে নষ্ট করতে চায় না৷ তবে ও আমাকে এখন আবার ফোনই বা দিচ্ছে কেনো? 


রাতে বাসায় এসে ফোনটা যখন হাতে নিয়ে দেখলাম নীলিমা অনেকবার ফোন দিয়েছে৷ ধরছি না দেখে অনেকগুলো মেসেজ দিয়েও রেখেছে৷ তার শুধু একটাই কথা কাল যেনো আমি তার সাথে থাকি আর সারাটি দিন সময় দেই৷ জানিনা মেয়েটা আবার আমার জীবনে কেনো আসছে? প্রথমে বাঁশ দিয়ে কি মন ভরেনি? নাকি পুরো বাঁশ বাগান দিয়ে দিবে এবার?😁😁😁৷ 


নীলিমা আর আমি আমাদের সেই চিরচেনা বট গাছটার নিচে বসে আছি৷ নীলিমা সেই প্রথম দিনেই মতোই আজ নীল শাড়ী পড়ে এসেছে৷ তবে আজকে তার নীল শাড়ী আমাকে তার প্রতি কোনো আকৃষ্ট করছে না৷ নীলিমা চুপ করে বসে রয়েছে কোনো কথা নেই দুজনার মাঝে৷ সকালে মিলিকে না জানিয়েই বাসা থেকে বের হয়ে এখন আমরা দুজনে নিরিবিলি বসে আছি৷ আমি কেনো এসেছি সেটার কারণ বলতে পারছি না তবে কি এখনও নীলিমাকে ভালোবাসি? হয়তো না তবে তার অনুরোধ রাখতেই শেষ বারের মতো তার সাথে দেখা করতে এসেছি আমি এর পরে সে চাইলেও আমি আসবো না কেনই বা আসবো? আমার ঘরে ওয়াইফ আছে যে আমাকে অনেকটা ভালোবাসে৷ 


- কেমন লাগছে আমাকে? 

- হুমম ভালো 

- শুধুই কি ভালো আর কিছু বলবে না? 

আমি কথা বাড়ালাম না৷ নীলিমাও চুপ হয়ে গিয়েছে৷ 

- আচ্ছা তোমার স্ত্রী নিশ্চয় তোমাকে অনেক ভালোবাসে? 

- হ্যা 

- আর তুমি? 

- আমিও তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি তার পাগলামিটা আমাকে তাকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখিয়েছে৷ 

- সিয়াম একটা কথা জিজ্ঞাসা করি? 

- হুমম 

- তুমি কি এখনও আমাকে ভালোবাসো? 

- এ কথা এখন তোমার মুখে মানায় না। এতো কিছু হবার পরেও তুমি আমার কাছ থেকে কি আশা করো যে আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি? না তবে তোমার কথা মাঝে মাঝে মনে হয় কিন্তু এটাকে আমি ভালোবাসা বলবো না। এটা মায়া! মায়া বড়ই অদ্ভুত যখন কারও প্রতি ভালোবাসাটা বেড়ে যায় তার প্রতি মায়াটাও ততটা বেড়ে যায় যদি কখনও ভালোবাসার অবসান ঘটে তখন মায়াটা কাজ করে। আর এই মায়ার কারণেই মানুষ ভিতরে ভিতরে জ্বলতে থাকে৷ তবে আমার মায়া তোমার জন্য আমার ভিতরে এখন আর জ্বলে না সেটা এখন প্রায় নিভু নিভু আর তুমি এই মুহুর্তে চাইছো সেটাকে আবারও জ্বালিয়ে দিতে। কিন্তু তুমি এটা করতে পারবে না তুমি কি মনে করো তোমাকে ভালোবাসি বলেই এখানে এসেছি? না তোমার প্রতি আমার যে এখনও মায়াটা জ্বলে আছে সেটাকে নিভিয়ে দেবার জন্যই এখানে আসা। আমি চাই এই নীলিমা নামক মায়াটা এখানেই শেষ করতে৷ তাই আশা করবো তুমি এর পর থেকে আমার সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না৷ আমি জানি তুমি হয়তো ভাবছো আমি তোমাকে তোমার কর্মের শাস্তি দিচ্ছি! হ্যা তা কিছুটা দিচ্ছি। এখন আবার বলে বসো না যে তুমি আমাকে ভালোবাসো৷ যেটাকে তুমি ভালোবাসা ভাবছো এটা ভালোবাসা না এটা নিজের স্বার্থকতা আজ যদি আয়ান ছেলেটা তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার না করতো তাহলে তুমি কখনই আমার কথা মনে করতে না৷ যখন সে তোমার সাথে খারাপ আচরণ করলো আর তুমি চলে আসলে তখন তোমার আমার কথা মনে পড়েছে। কারণ তুমি তখন একা হয়ে পড়েছো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছো যার ফলেই তুমি আমার সাথে যোগাযোগ করতে এসেছিলে সেদিন হুট করে৷ সব শেষে নীলিমা একটা কথায় বলবো জীবন খুব ছোট। এই ছোট্ট জীবনে অনেক কিছুই হুট করে আসে আবার সেটা ঝড়ের সাথে চলেও যায়৷ তবে যেটা ধীর গতিতে আসে সেটা হাজার ঝড় তুফান হলেও রয়ে যায়৷ এখন বাসায় যাও আর গিয়ে ভাবো সেদিনটার কথা যেদিন তুমি প্রথম ভুল করেছিলে৷ অনেক কথা বলে ফেললাম বাসায় যেতে হবে মিলি হয়তো ঘুম থেকে উঠে আমাকে দেখতে না পেয়ে চিন্তা করছে৷ 

কথাগুলো শেষ করে উঠে দাঁড়ালাম৷ নীলিমা মাথা নিচু করে কান্না করছে৷ চলে আসার সময়ও নীলিমা কোনো কথা বললো না ঠাই মাথা নিচু করে বসে আছে৷ একটু কান্না না-হয় করুক এতে বুঝতে পারবে সে কি ভুলটাই না করেছে৷ হয়তো সে কিছুদিন আমাকে নিয়ে ভাববে তার পর আবারও ভুলে যাবে। আসলেই কি ভুলে যাবে? 


বাসায় আসতেই মা বলে উঠলেন 

- কিরে সকাল করে কাওকে না জানিয়ে কোথায় গিয়েছিলি ফোনটাও নিয়ে যাসনি৷ 

- ওই একটু হাঁটতে বের হয়েছিলাম 

- উপরে যা মিলি তোর জন্য অপেক্ষা করছে৷ 

উপরে উঠে দেখি মিলি খাটের উপর মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। তাকে না জানিয়ে যাওয়ায় বোধ হয় সে বড্ড রেগে আছে। 

- কোথায় গিয়েছিলে হ্যা ( ঠোঁটের কোনে আলতো রাগের ছায়া)  

কোনো কথা না বাড়িয়ে মিলিকে বেশ শক্ত করে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলাম৷ 

- বড্ড ভালোবাসি তোমায় মিলি। তোমার থেকে এতোদিন কিছুটা এড়িয়ে চলায় আমাকে মাফ করে দিও। 

- আজ হঠাৎ এতো ভালোবাসা ( বুক থেকে মাথাটা উঁচু করে চোখে চোখ রেখে) 

- আজ যে সকল মিছে মায়া ত্যাগ করে এসেছি৷ 

- বুঝলাম না 

- তোমাকে বুঝতেও হবে না 

বলেই মিলির কপালে আলতো করে একটা ভালোবাসার চুম্বন দিলাম৷ 

- আহা এতো ভালোবাসা যে আমি কোথায় রাখি।  

- রাখতে হবে না ফেরত দিয়ে দিও তোমার পাগলামো ভালোবাসা দিয়ে৷ 

মিলি হো হো করে হেঁসে উঠলো৷ হাসলে তার গালে টোল পড়ে এটা আজ দেখলাম৷ বেশ লাগছে তাকে। 


সমাপ্ত 


ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন৷ অনেক দিন না লিখার কারণে গল্পটা হয়তো তেমন ভাবে গুছিয়ে লিখে উঠতে পারিনি তার জন্য দুঃখিত৷ আর সবাইকে গল্পটা কষ্ট করে সময় দিয়ে পড়বার জন্য ধন্যবাদ

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post